বিনা পয়সায় সাঁতার শেখা

0
231

তখনো নিজের জীবনযুদ্ধ চলছিল। চাকরির এক বছর বাকি। সে সময় অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে পানিতে ডুবে কয়েকটি শিশুর মৃত্যু হয়। এতে ভীষণ কষ্ট পান তিনি। চিন্তা করেন, সাঁতার জানলে এতগুলো প্রাণের এভাবে মৃত্যু হতো না। এরই মধ্যে এক প্রতিবেশীর ছেলে ডুবে মারা যায়। এ খবর তাঁকে আরও বেশি শোকাহত করে।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে একদিন নতুন চিন্তা মাথায় আসে ঈশ্বরদী পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের কার্যসহকারী ইমামুল হকের। সেই চিন্তার বাস্তবায়ন করতে আর সময় নিলেন না। ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে সাঁতার শেখানো শুরু করেন। এ পর্যন্ত ৩০০ শিশু-কিশোর ও নারী-পুরুষকে বিনা পয়সায় সাঁতার শিখিয়েছেন তিনি।

ইমামুল বলেন, ‘আমি টেলিভিশনে খবর দেখতাম খুব। শিশুরা পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার খবর দেখলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারতাম না। মনে হতো, বাচ্চাগুলোকে কেন কেউ সাঁতার শেখায় না। তখন চাকরি করতাম আর বিষয়টা নিয়ে ভাবতাম। তারপর একদিন শুরুই করে দিলাম।’ তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ির পুকুরটি কাটানো হয় ১৯৯২ সালে। বছর তিনেক আগে সংস্কার করি। ভাবলাম, এই পুকুরেই তো শিশুদের সাঁতার শেখানোর চিন্তাটা করতে পারি। তাই আর দেরি করি নাই।’

নির্লোভ ইমামুল হকের বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদীর সাঁড়া গোপালপুরের বকশির চক গ্রামে। নিজের বাড়ির ৮০ ফুট লম্বা ও ৫০ ফুট চওড়া পুকুরটিকে সাঁতার প্রশিক্ষণের উপযোগী করে তুলতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় তাঁকে। কেনেন রাবারের আটটি টিউব ও ফুটবল। পুকুরে ওঠানামার জন্য বানান বাঁশের সিঁড়ি। সাঁতার শিখতে আসা মানুষের বিশ্রাম নেওয়ার কথা ভেবে পুকুরপাড়ে বানান সিমেন্টের বেঞ্চ।

স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে ইমামুলের সংসার। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চাকরি থেকে অবসর নেন। সম্পত্তি বলতে আছে বিঘা তিনেক জমি। এই জমিতে চাষাবাদের আয় ও পেনশনের টাকা দিয়ে সাংসারিক খরচ চলে। বড় ছেলে সুজন বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক। ছোট ছেলে সৌরভ পাবনা পলিটেকনিকের ছাত্র।

প্রথমে দুই ছেলে ও এক পুত্রবধূকে সাঁতার শেখান ইমামুল। এরপর প্রতিবেশী ও নিকট আত্মীয়দের সাঁতারে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। এভাবে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর সাঁতার শেখানোর কথা। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসতে থাকে নানা বয়সী মানুষ। তিনি সিদ্ধান্ত নেন আগে শেখাতে হবে বিদ্যালয়ের শিশুশিক্ষার্থী ও কিশোরদের। এরপর বড়দের। নারীদেরও সাঁতার শেখাতে তিনি স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনকে প্রশিক্ষিত করেন। তিনি জানান, বর্তমানে ঈশ্বরদী ছাড়াও বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কাছে সাঁতার শিখতে আসছে।

ইমামুলের সাঁতার প্রশিক্ষণকেন্দ্রে শিশু-কিশোর, নারী ও পুরুষদের মোট তিনটি ব্যাচ রয়েছে। শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। এই ব্যাচে ৩০ জন শিক্ষার্থী একযোগে সাঁতার শেখে। প্রশিক্ষণের মেয়াদ তিন মাস। প্রশিক্ষণ শেষে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান সম্পাদন ও পুরস্কারের সব খরচ ইমামুলই দেন।

টাকার উৎস সম্পর্কে ইমামুল বলেন, ‘এসব কাজে তো খুব বেশি টাকা লাগে না। সবচেয়ে বেশি যা লাগে, তা হলো ইচ্ছাশক্তি। জমিতে আবাদ থেকে পাওয়া অর্থের কিছুটা আর পেনশনের টাকার কিছু অংশ দিয়ে আমার এই কাজ চলে যায়। তা ছাড়া, ছেলেও মাঝেমধ্যে দেয়।’

সরেজমিনে দেখা যায়, পুকুরপাড়ে ছেলেমেয়েরা আনন্দ করছে। ইমামুল তাদের পুকুরে নামাচ্ছেন। এরপর তাদের হাতে রাবারের টিউব ধরিয়ে সাঁতারের কলাকৌশল শেখানো শুরু করেন। ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী শারমিন নাতাশা ও তার ছোট ভাই মাহিম এসেছে বাবার সঙ্গে সাঁতার শিখতে। নাতাশা জানায়, এক মাসেই সে সাঁতার শিখতে পেরেছে।

ইমামুল বলেন, সবারই সাঁতার শেখা উচিত। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও সাঁতার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা দরকার। প্রয়োজনে বিদ্যালয় ঘুরে ঘুরে সাঁতার শেখাতে রাজি তিনি।

সুত্র: মাহাবুবুল হক
প্রথম আলো, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৪