স্যামসন এইচ চৌধুরী

0
49

সততা, নিষ্ঠা, শ্রম, মেধা ও শৃংখলা একজন মানুষকে যে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যেতে পারে তার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত স্কয়ার গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরী। যিনি আস্থা ও মনোবলকে পুঁজি করে শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছেছিলেন।

এ দেশের শিল্প ও ব্যবসা প্রসারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান প্রশংসনীয়। প্রতিকূল অবস্থাকে পাশ কাটিয়ে শূন্য থেকে স্কয়ার গ্রুপ যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশের মধ্যে শীর্ষে উঠে এসেছে তিনি হলেন প্রয়াত স্যামসন এইচ চৌধুরী। গতকাল সোমবার ছিল তাঁর ৯১তম জন্মদিন। দেশবরেণ্য এই শিল্পপতির জন্মদিনে পরিবারের পক্ষ থেকে পাবনার এস্ট্রাস খামার বাড়িতে প্রার্থনা সভাসহ বিভিন্ন সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ৫৯ বছর আগে স্যামসান এইচ চৌধুরীর নেতৃত্বে চার বন্ধু মিলে পাবনা শহরে শালগাড়িয়া এলাকায় যে ছোট্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটি আজ মহিরুহ। ১৯৫৮ সালে যে প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্কয়ারের যাত্রা শুরু হয়েছিল তার নাম ছিল স্কয়ার ফার্মা। পুঁজির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা। ১৯৬৪ সালে স্কয়ার ফার্মা নাম পরিবর্তন করে করা হয় স্কয়ার ফর্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড। ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও ছিমছাম ছিল কারখানাটি।

স্কয়ার নামের মহত্ব আরো গভীরে। সেদিন চার বন্ধু মিলে আট হাতে গড়ে তুলেছিলেন এক বর্গাকার চতুর্ভুজের। স্কয়ার মানে হচ্ছে সেই বর্গাকার চতুর্ভূজ। কিন্তু পারফেক্ট না হলে যেমন চতুর্ভূজ বর্গাকার হয় না। তেমনি নৈতিক বিশুদ্ধতা না থাকলে জীবনে সাফল্য আর লাভ করা যায় না। সেই পারফেক্টের চিন্তা থেকেই তাদের গ্রুপের নামকরণ করা হয় স্কয়ার। এ প্রসঙ্গে স্যামসান এইচ চৌধুরী ওই সময় বলেছিলেন, ‘স্কয়ার মানেই পারফেকশন। এ জন্যই আমরা নাম রাখলাম স্কয়ার।’

১৯৮৮ সাল থেকে ওষুধের পাশাপাশি স্কয়ার গ্রুপ নতুন শিল্প স্থাপন শুরু করে। ওই সময়ে স্কয়ার ফার্মার একটি আলাদা বিভাগ হিসেবে স্থাপন করা হয় স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড। ১৯৯৫ সালে স্কয়ার টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। স্কয়ারের সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ টেক্সটাইল খাতে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কনজ্যুমার পণ্য। এ দুটি খাতে তাদের প্রবৃদ্ধির হার ঈর্ষণীয়। স্কয়ারের প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে স্কয়ার ফার্মেসিউটিক্যালস লিমিটেড, স্কয়ার স্পিনিংস লিমিটেড, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, স্কয়ার কনজুমার প্রডাক্টস, স্কয়ার ইনফারমেটিক্স, স্কয়ার সারাহ নিড ফেব্রিক্স, স্কয়ার হসপিটালস, স্কয়ার এগ্রো, স্কয়ার হারবাল অ্যান্ড নিউট্রিসিটিক্যাল, এজিএস সার্ভিসেস, মাছরাঙা প্রডাকশন, প্যাকেজস, বর্ণালী প্রিন্টার্স, মিডিয়া কম ও মাছরাঙা টেলিভিশন। এ ছাড়া হাউজিং কোম্পানি শেলটেক, পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে স্কয়ার গ্রুপের শেয়ার রয়েছে।

জীবনালেখ্য
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী স্যামসন এইচ চৌধুরী ১৯২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার কাশীয়ানী থানার আড়–য়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন ইয়াকুব হোসেন চৌধুরী। স্যামসন চৌধুরী ভারতে পড়াশুনা শেষ করে ১৯৫২ সালে পাবনা জেলার আতাইকুলায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একটি ফার্মেমির মেডিকেল অফিসার। ১৯৫৮ সালে চার বন্ধু মিলে আতাইকুলায় গড়ে তোলেন স্কয়ার ফার্মাসিটিউক্যালস। বর্তমানে এই স্কয়ার ফার্মার বাৎসরিক টার্নওভার ৬১৬ কোটি মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে স্কয়ার ফার্মায় ৩০ হাজারসহ স্কয়ার গ্রুপের ৫০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। স্যামসন এইচ চৌধুরীর সহধর্মিনী অনিতা চৌধুরী। স্যামসন এইচ চৌধুরীর বড় ছেলে স্যামুয়েল এস চৌধুরী যিনি বর্তমানে স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান, বোন রত্না পাত্র স্কয়ার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান, মেজ ছেলে তপন চৌধুরী স্কয়ার ফার্মাসিটিউক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ছোট ভাই অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু স্কয়ার টয়লেট্রিজ মাছরাঙা টেলিভিশনসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

স্যামসন এইচ চৌধুরী ঢাকার ম্রেট্রোপলিটান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সাবেক সভাপতি, মাইডাসের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ফার্মাসিটিউক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশানের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ পাবলিক লিসটেড কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান, ঢাকা ক্লাবের আজীবন সদস্য, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক, এক্সিকিউটিভ মেম্বার বাংলাদেশ ফ্রাঞ্চ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (আইসিসিআই), উপদেষ্টা ও সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি, বাংলাদেশ হারবাল প্রোডাক্টস প্রস্তুতকারক সমিতির প্রেসিডেন্ট, মিউচুয়্যাল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান, টিআইবির সাবেক চেয়ারম্যান ও টাস্ট্রি, শাহবাজপুর টি এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

এ ছাড়া স্যামসন চৌধুরী ১৯৯৮ সালে আমেরিকান চেম্বার কর্তৃক বিসনেজ এক্সিকিউটিভ অব দি ইয়ার, ২০০০-২০০১ সালে ডেইলি স্টার এবং ডিএইচএল কর্তৃক বেস্ট এন্টারপ্রেনার অব দি কান্ট্রি, ২০০৩ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংক অ্যাওয়ার্ড, ২০০৫ সালে ব্যাংকার্স ফোরাম অ্যাওয়ার্ড, ২০০৬ সালে আইসএবি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। এ ছাড়া ২০০৭ ও ২০০৮ সালে পর পর দুই বছর দেশের সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৫ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক সেরা করদাতা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পান। ২০০৯ এবং ২০১০ সালে সিআইপি মনোনীত হন। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি সিঙ্গাপুরে তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁকে পাবনা শহরের কাশীপুরের বাসভবন এস্ট্রাসে সমাহিত করা হয়।

স্যামসন চৌধুরী দেশের শীর্ষ শিখরে পৌঁছলেও ভুলে যাননি অতীত। পাবনাকে খুব ভালবাসতেন। তিনি পাবনার অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরির আধুনিকায়ন করেন। বনমালি শিল্পকলা কেন্দ্র, পাবনা প্রেসক্লাবসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে তিনি সহায়তা করেন। তিনি ছিলেন পাবনা প্রেসক্লাবের সম্মানিত জীবন সদস্য। এ ছাড়া পাবনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রয়েছে তাঁর অবদান।